ঢাকা, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০

প্রাথমিকে সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ সৃষ্টি, খুশি নন শিক্ষকরা

:: বিশেষ প্রতিনিধি || প্রকাশ: ২০১৮-১০-৩১ ১০:৪০:০৫

দেশের প্রায় ৬৫ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পাশাপাশি সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ সৃষ্টি করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই পদে নিয়োগ পাবেন সহকারী শিক্ষকদের মধ্য থেকে একজন। এতে বর্তমানে প্রধান শিক্ষকদের সাথে সহকারী শিক্ষকদের যে বেতন বৈষম্য রয়েছে তা নিরসন হবে বলে মনে করছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তে খুশি হতে পারছেন না প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা। তারা বলছেন, নতুন এই পদ সৃষ্টি হলে সহকারী শিক্ষকরা স্থায়ী বৈষম্যের শিকার হবেন।

জানা যায়, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকদের পরের ধাপে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকদের বেতন নির্ধারণের দাবিতে চলতি বছরের শুরু থেকে আন্দোলন করে আসছেন সহকারী শিক্ষকরা। দাবি আদায়ের জন্য কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে আমরণ অনশনও করেছেন শিক্ষকরা। পরে প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান ফিজারের আশ্বাসে অনশন ভাঙেন তারা। মন্ত্রী তখন আশ্বাস দেন এই বৈষম্য নিরসন করা হবে। মন্ত্রণালয় বলছে, বেতন বৈষম্য নিরসনের জন্যই নতুন এই পদটি সৃষ্টি করা হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকরা ১১তম গ্রেডে বেতন পান। আর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকরা বেতন পান ১৪তম গ্রেডে। প্রশিক্ষণবিহীন সহকারী শিক্ষকরা বেতন পান ১৫তম গ্রেডে। শিক্ষক নেতারা বলছেন, সরকারের কাছে আমাদের দাবি ছিলো বেতন বৈষম্য নিরসনের। সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ সৃষ্টির দাবি ছিলো না। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণারও ইঙ্গিত দেন তারা।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ সৃষ্টির বিষয়টি এর আগে গণমাধ্যমে নিশ্চিত করেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার। তিনি বলেন, ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সব শিক্ষকের বেতন গ্রেড ঠিকঠাক করার জন্য কাজ শুরু হয়েছে। আগামী এক মাসের মধ্যে আমরা কাজগুলো শেষ করতে চাই। এর মাধ্যমে শিক্ষকদের বেতন গ্রেড বাড়বে। সহকারী প্রধান শিক্ষক নামে নতুন একটি পদ সৃষ্টি করা হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষকদের বেতনভাতার জন্য যে আশ্বাস দেয়া হয়েছিলো তা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে। শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরেই আন্দোলন করছেন, আমি নিজে তাদের অনশন ভাঙিয়েছি, প্রতিশ্রুতিও দিয়েছি। সেগুলোই বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেছি।’

এদিকে শিক্ষকরা মনে করছেন বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের যে অবস্থা, তাতে সহকারী প্রধান শিক্ষকের প্রয়োজন নেই। একটি বিদ্যালয়ের যা কাজ তার প্রায় সবই সহকারী শিক্ষকরা করছেন। নতুন এই পদ সৃষ্টি করাকে কোনো ভাবেই মানতে পারছেন না তারা। বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও নেতিবাচক মন্তব্য করতে দেখো গেছে। অধিকাংশ শিক্ষকরাই বলছেন, পদটি সৃষ্টি হলে সহকারী শিক্ষকদের বৈষম্য স্থায়ী হবে। আর সহকারী প্রধান শিক্ষকরা কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠবেন। তারা বলছেন, সহকারী প্রধান শিক্ষক নয়, বরং ৬৫ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অফিস সহকারীর দরকার।

প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক সমাজের সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী রবিউল বলেন, মন্ত্রণালয় সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ সৃষ্টির যে কথা বলছে, আমরা তাকে সরকারের পলিসি বলে মনে করছি। কারণ আমরা ফিল করছি, এই মুহূর্তে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ পদটি দরকার নেই। এই সিদ্ধান্তে আমরা খুবই মর্মাহত। এখন ৬৫ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৪ লাখের মতো শিক্ষক রয়েছেন। এরমধ্যে প্রত্যেক স্কুলে একজন করে সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ সৃষ্টি করে নতুন একটি সমস্যার সৃষ্টি করা হচ্ছে।

তবে বর্তমানে সহকারী প্রধান শিক্ষকের চেয়ে বিদ্যালয়গুলোতে অফিস সহকারী বেশি দরকার বলে মনে করেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক অনলাইন সমিতির সভাপতি কাজী আবু নাসের আজাদ। তিনি বলেন, ‘প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে এখন অনেক কাজ। তাই প্রত্যেক বিদ্যালয়ে একজন অফিস সহকারী খুব দরকার। আমি ব্যক্তিগতভাবে এই মুহুর্তে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে সহকারী প্রধান শিক্ষকের প্রয়োজন আছে তা মনে করি না।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের প্রায় চার লক্ষ সহকারী শিক্ষকের দাবি, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের পরের ধাপেই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকদের বেতন নির্ধারণ করা। দেশের বেশিরভাগ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষক সংখ্যা গড়ে ছয় থেকে সাত জন। তাই এই স্বল্প সংখ্যক শিক্ষকের জন্য একজন প্রধান শিক্ষক থাকার পর সহকারী প্রধান শিক্ষক পদটি গুরুত্বহীন।’

বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক মহাজোটের মুখপাত্র কাজী খালেদা বলেন, ‘সরকার এই মুহূর্তে যদি সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ সৃষ্টি করে তাহলে বর্তমানে যে বৈষম্য চলছে তা স্থায়ী হবে। আমরা সরকারের এই সিদ্ধান্ত ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারছি না। এখন যদি এই পদটি সৃষ্টি করা হয়, সেক্ষেত্রে সহকারী প্রধান শিক্ষকরা এসে সহকারীদের উপর প্রভাব খাটাবে। তাই আমরা স্ট্রংলি এর প্রতিবাদ করছি।’

সরকারের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা করা হবে উল্লেখ করে এই শিক্ষক নেতা বলেন, ‘আমরা যা চেয়েছি, আমাদের তা না দিয়ে নতুন এক সংকটের মধ্যে ফেলা হচ্ছে। তাই আমরা এ সিদ্ধান্তকে কোনো ভাবেই মেনে নিতে পারছি না। প্রয়োজন হলে কঠোর কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিবাদ জানাবো।’

প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি আতিকুর রহমান বলেন, বর্তমানে প্রধান শিক্ষকদের সাথে আমাদের বেতনের যে পার্থক্য তা নিরসন করার জন্য আমরা আন্দোলন করে আসছি। এখন আবার সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ সৃষ্টি করা হচ্ছে। যা গ্রহণযোগ্য নয়। এমনিতই বেতন বৈষম্যের কারণে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার মান কমে যাচ্ছে। নতুন করে এই পদ সৃষ্টি হলে শিক্ষার মান আরও কমবে।

পদটি যেন সৃষ্টি করা না হয় এ জন্য মন্ত্রণালয়ের সাথে কথা বলা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা আগেও বলেছি, এখনো বলছি, আমাদের দাবি বেতন বৈষম্য নিরসন করা। নতুন পদ সৃষ্টি নয়। আলোচনা সাপেক্ষে সমস্যার সমাধান না হলে কর্মসূচি ঘোষণা করা ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা থাকবেনা।’