ঢাকা, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০

সামাজিক আন্দোলনে ঝুঁকছে কোটা আন্দোলনকারীরা

:: বিশেষ প্রতিনিধি || প্রকাশ: ২০১৮-১১-০৬ ০৯:১১:২৩

সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের জন্য গড়ে ওঠা সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্লাটফর্ম বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতারা এবার সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সরব রয়েছেন। ঝুঁকছেন বিভিন্ন সামাজিক কাজে। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ঘ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস এবং সেই পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে জোড়ালো আন্দোলন করে সংগঠনটি। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যেসব মেধাবীরা বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ বা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পেয়েও আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে ভর্তি হতে পারছেন না তাদের ভর্তির ব্যবস্থাও করেছে আন্দোলনের নেতাকর্মীরা। তারা বলছেন, সাধারণ শিক্ষার্থীদের কল্যাণকর যেকোনো ইস্যুতে আমরা সরব থাকবো।

জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে সরকারি চাকরিতে ৫৬ শতাংশ কোটা ব্যবস্থা চলে আসছিলো। চলতি বছরের শুরু থেকে কোটা সংস্কারের জোর দাবি জানায় শিক্ষার্থীরা। বিভিন্ন আন্দোলনের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরির ক্ষেত্রে সকল প্রকার কোটা বাতিল করেন। পরে তার পরিপত্র জারি করে সরকার। তবে আন্দোলনকারীরা বলছে, কোটা বাতিল নয়, যৌক্তিক সংস্কার করতে হবে।

অনেকেরই ধারণা ছিলো, বর্তমান সরকারের শেষ সময়ে এসে কোটা বাতিলের যে পরিপত্র জারি হয়েছে তারপর আর আন্দোলনের প্লাটফর্ম থাকবে না। এর কার্যক্রম শেষ হয়ে যাবে। সে ধারণা ভুল প্রমাণ করে পূর্বের মতোই সরব রয়েছেন তারা। এখন নিয়মিত বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছেন তারা।

সম্প্রতি বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ ঢাকায় একটি সম্মেলন করে। এতে অংশ নেয় কোটা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজের আহ্বায়কসহ কেন্দ্রীয় কমিটির নেতারা। প্রথমে পুলিশ বাধা দিলেও পরে সম্মেলন করে তারা। সম্মেলনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় কমিটি সারাদেশের নেতাদের জানিয়ে দেয়, সংগঠনটি সারাদেশের ছাত্রদের সকল কল্যাণকর কাজে পাশে থাকবে।

এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ঘ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস এবং সেই পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে জোড়ালো আন্দোলন করে তারা। প্রথমে পরীক্ষা বাতিল চেয়ে অনশন করা ঢাবির আইন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র আখতার হোসেনের সাথে সংহতি প্রকাশ করলেও পরে বিক্ষোভ মিছিলসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে। শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পরীক্ষা বাতিল করতে বাধ্য হয়।

এছাড়া এ বছর ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়া এক শিক্ষার্থী কোটা আন্দোলনের নেতাদের মাধ্যমে আর্থিক সহযোগিতা পায়। পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েও ভর্তি হতে পারছিলেন না এমন দুজন শিক্ষার্থীর আর্থিক সহায়তা পেতে কাজ করেন আন্দোলনের নেতারা। আর্থিক সহায়তার ক্ষেত্রে তারা দেশের বিভিন্ন বিত্তবানদের সাহায্য কামনা করেন। আন্দোলনকারীরা বলছেন, আমাদের ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমে আমরা এই বিষয়গুলো পোস্ট করি। এরপর অনেকেই এগিয়ে আসেন।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের আহ্বায়ক হাসান আল মামুন বলেন, ‘আমাদের উত্থান হয়েছে পুরো ছাত্র সমাজের অধিকার আদায়ের জন্য। দেশের যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে-কলেজে যদি কোনো ভাই-বোন সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকেন, আর তা যদি আমরা জানতে পারি তাহলে অবশ্যই আমরা পাশে দাঁড়াবো। শিক্ষার্থীদের কল্যাণের জন্য কাজ করাই আমাদের লক্ষ্য। এছাড়া সামাজিক আন্দোলনটা আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। দেশের বিভিন্ন যৌক্তিক ইস্যু নিয়ে ছাত্র সমাজ কথা না বললে অন্য কেউ আর কথা বলতে পারবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের একটা ফেসবুক গ্রুপ রয়েছে। এতে প্রায় ১৯ লাখ সদস্য। গ্রুপটি একটি মিডিয়ার মতো কাজ করে। আমরা যখন কোনো শিক্ষার্থীর সহযোগিতার জন্য আহ্বান করি, তখন অনেকেই এগিয়ে আসেন। কারণ, সাধারণ মানুষ আমাদের বিশ্বাস করেন। আর তাদের বিশ্বাস আছে বলেই আমরা শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে পারছি। এই গ্রুপ ব্যবহার করেই আমরা বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীকে বুয়েট, ঢাবি এবং জাবিতে ভর্তির জন্য হেল্প করেছি।’

জানা যায়, আন্দোলনের শুরুর সময় থেকেই বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ ব্লাড ডোনেশনে সরব ছিলো। শুধু ঢাকা নয়, সারাদেশের বিভিন্ন এলাকায় অসুস্থ রোগীর জন্য রক্ত জোগাড় করে দিয়েছে সংগঠনটির নেতারা। প্রথমে সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত রক্ত খোঁজা হয়, না পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট এলাকার বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে খোঁজ নিয়ে রক্ত জোগাড় করা হয়। সম্প্রতি গঞ্চগড়ে বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই দুর্ঘটনায় নিহত হয় ১০ জন। আর যারা আহত হয় তাদের জন্য স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক রক্তের ব্যবস্থা করে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ।

এছাড়া স্কুল শিক্ষার্থীদের সড়ক আন্দোলন, শ্রমিকদের ধর্মঘটের প্রতিবাদ, জেএসসির পরীক্ষা পেছানোসহ বিভিন্ন ইস্যুতে সরব ছিলো কোটা আন্দোলনের নেতারা। এছাড়া বাল্য বিবাহ, শিশু ও নারী নির্যাতন, নিরক্ষরতা দূর, ইভটিজিংসহ বিভিন্ন সামাজিক কাজে অংশ নিতে চায় সংগঠনটি।

বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল হক নূর বলেন, ‘আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায় ও বিভিন্ন কল্যাণকর কাজের জন্যই সংগঠিত হয়েছিলাম। কোটার বিষয়টাতে আমরা একটা সমাধান পেয়েছি। তাই বলে আমাদের প্লাটফর্ম নষ্ট হবে তা নয়। বরং সামাজিক বিভিন্ন কাজের মাধ্যমে আমরা টিকে থাকতে চাই। কারণ, রাজনৈতিক বলয়ের বাইরে থেকে আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করে যাবো।’

কওমি শিক্ষার সর্বোচ্চ স্তর দাওরায়ে হাদিসকে স্নাতকোত্তরের সমমান দেয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেয়া সংবর্ধনার কারণে গত রোববারের জেএসসি পরীক্ষা স্থগিত করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এতে একটানা তিনটি কঠিন পরীক্ষা দিতে হবে শিশু শিক্ষার্থীদের। এর প্রতিবাদ জানিয়েছে কোটা আন্দোলনের নেতারা। আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়ক মুহাম্মদ রাশেদ খাঁন ফেসবুকে লিখেছেন, ‘বাচ্চাদের পরীক্ষা পেছানোর সিদ্ধান্ত পুরো বাংলাদেশকে কষ্ট দিয়েছে।’ তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘রাজনৈতিক কারণে বাচ্চারা কেন একটানা পরীক্ষার চাপে পড়বে?’

ঢাবির টিএসসিকেন্দ্রিক একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের সদস্য ও বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী বলেন, ‘ছাত্রদের আন্দোলনের কারণে ২০১৮ সাল বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ১৮ হলো হার না মানা বয়স। তাই কোটা আন্দোলন বলেন আর সড়ক আন্দোলন বলেন, সব আন্দোলনের জন্যই আন্দোলনকারীরা প্রশংসার দাবি রাখে।’
বিষয়গুলো নিয়ে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের সাথে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘আমাদের ছাত্র রাজনীতির একটা দৈন্যদশা এতদিন আমরা দেখে এসেছি। ৯০-এর ছাত্র আন্দোলনও দেখেছি। সে সময় সাধারণ ছাত্রদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ছাত্র নেতারা কাজ করতো। এখন দলীয় লেজুড়বৃত্তির বাইরে তো কোনো ছাত্র সংগঠনকেই তেমন অংশ নিতে দেখা যায় না। সেই জায়গা থেকে বিবেচনা করলে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ বেশ ভালো কাজ করছে। তারা ‘ঘ’ ইউনিটের বিতর্কিত পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে মাঠে থেকেছে। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করছে। ফেসবুকে এসব দেখছি। ভালো লাগছে।’

নোট: প্রতিবেদনটি আমার সংবাদ থেকে নেয়া।