ঢাকা, মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট ২০২০

অফিস মিটিংঃ কার্যকরী কিছু নাকি সময়ের অপচয়?

:: নাজমুল হোসাইন || প্রকাশ: ২০১৯-১০-২৩ ০০:২৬:৩৩

যেকোন প্রতিষ্ঠানের জন্য “মিটিং” খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। যেকোন কাজের শুরুতে, শেষে এবং কাজের সময়ের প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে গ্রুপ মিটিং কাজের গতি যেমন বাড়ায় তেমনি যার যার দায়িত্ব এবং নিজেদের বোঝাপড়ার জায়গাটাও অনেক বেশি স্পষ্ট হয়।

শুধু প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে না, ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় সকল ক্ষেত্রেই “ইফেক্টিভ মিটিং” খুব জরুরী। সামাজিক সমস্যা, ব্যক্তিগত বিরোধ, স্থানীয় বা গোত্রীয় কলহ এমনকি বড় বড় যুদ্ধের বা খেলার আগেও যার যার দলের নিজেদের মধ্যে আভ্যন্তরীণ মিটিং করতে হয় গেইম প্ল্যান ও আইডিয়া শেয়ার করার জন্য; অন্যথায় নিজেদের মধ্যে সমন্বয় ও দিক নির্দেশনার অভাবে অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।

যেহেতু কর্পোরেটে সবার প্রতিষ্ঠানেই অনেক মিটিং করতে হয় তাই এই সেক্টরটিতে প্রতিটি মিটিং ইফেক্টিভভাবে করা অনেক বেশি প্রয়োজন।

তবে একটি তিক্ত বাস্তবতা হচ্ছে অনেক মিটিংয়েই স্রেফ সময় এবং এনার্জি নষ্ট ছাড়া কিছুই হয়না, অনেকক্ষেত্রে বোরিংও পর্যন্ত হয়ে যায় পুরো সময়টাই। আরো মজার একটি ব্যাপার হচ্ছে অনেক বড় সংখ্যক মিটিং গোছানো এবং ইফেক্টিভ কোন সমাপ্তি ছাড়াই শেষ হয়, শুরুতে যেই টপিক থাকে অনেকক্ষেত্রে শেষে তার অর্ধেকও থাকে না, এলোমেলোভাবে একটা সমাপ্তি হয়ে যায়।

আর এতে করেই কেউ কারো দায়িত্ব, দিকনের্দশনা বা করনীয় সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারনা পায়না। আবার সেই জনে জনে খুজে কথা বলে বা সমস্যা সামনে আসলে তখন বসেই সমাধান করা লাগে!

যেহেতু প্রতিটি ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানের বেতন পাচ্ছে তার মানে যতটুকু সময় নন-প্রোডাক্টিভ মিটিংয়ে নষ্ট করা হচ্ছে ওই সময় বা কর্মঘণ্টার যতটুকু মূল্য তার পুরোটাই প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি এবং যারা সময় নষ্ট করে তাদেরও ক্ষতি, সাথে মিটিংয়ের সাথে জড়িত যাবতীয় খাবার, বিদ্যুৎ, এবং যাবতীয় খরচ তো আছেই।

মিটিংগুলো এরকম নন-প্রোডাক্টিভ হওয়ার পিছনে বড় একটা কারন হচ্ছে বেশিরভাগ মিটিংয়ের কোন এজেন্ডা বা হোমওয়ার্ক থাকে না৷ মিটিংয়ের একটা উদ্দেশ্য বা টপিক থাকে সত্যি কিন্তু সেটা বিস্তারিত এজেন্ডা না।

ব্যাপারটা এমন দাড়ায় মিটিং ডাকা হয়, এবং সবাই যার যার মত মিটিংয়ে উপস্থিত হয়। যিনি বা যারা মিটিং ডাকে তারাই হয়ত যা বলার বলে আর বাকিরা শুনে, ইন্সট্যান্ট কোন ভ্যালু এড করা বা মন্তব্য করতে বললেও তখন সাথে সাথে সম্ভব হয়না।

কিন্তু সবাই যদি মিটিংয়ে যার যার উপস্থাপন করার বিষয়গুলো নিয়ে আগেই হোমওয়ার্ক করে তাহলেই সেটা অনেক বেশি পার্টিসিপেটিভ এবং ইফেক্টিভ হয়।

এক্ষেত্রে যারা মিটিং ডাকে আর যারা মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করেন উভয়পক্ষের দিক থেকেই অর্গানাইজড এবং সাপোর্টিভ হওয়া আবশ্যক। এই যাবতীয় কাজগুলো তিনটি ধাপে করা প্রয়োজন।

মিটিংয়ের আগে-
মিটিং ডাকার আগেই যিনি ডাকবেন তার নিজের ভালোমত প্রস্তুতি নিতে হবে। মিটিংটি কেন, কারা কারা এই মিটিংয়ের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় পক্ষ, আলোচ্য বিষয়গুলো কি কি থাকবে, সময় বন্টণ কিভাবে হবে, কার পরে কে বলবে – এরকম সমস্ত বিষয় আগে থেকেই গুছিয়ে রাখতে হবে।

একইভাবে যারা মিটিংয়ে আমন্ত্রিত হবে তাদেরও উচিত নিজেদের এজেন্ডা ঠিকমত লিখে রাখা এবং অল্প সময়ে কীভাবে জরুরী পয়েন্টগুলো উত্থাপন করা যায় সেসব নিয়ে প্রস্তুতি নেয়া।

মিটিংটি যদি হয় সকল ডিপার্টমেন্ট হেডদের মাসিক বা সাপ্তাহিক কো-অর্ডিনেশন মিটিং, সেক্ষেত্রে উনি নিজে মিটিংয়ে যাওয়ার আগে উনার টিম নিয়ে আভ্যন্তরীণ মিটিং আগে করে নেয়া প্রয়োজন।

মিটিংয়ের সময়-
পুরো মিটিং যিনি পরিচালনা করবেন উনার দায়িত্ব সবকিছু সুন্দরমত পরিচালনা করা এবং সময়ের দিকে খেয়াল রেখে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো আগে উপস্থাপন ও সমাধান করা। সেই সাথে অপ্রাসঙ্গিক আলোচনার আধিক্য যেন না চলে আসে সেই দিকেও খেয়াল রাখা।

যারা মিটিংয়ে আসবেন তাদেরও প্রত্যেকের উচিত সময়ের দিকে খেয়াল রেখে গুরুত্বের ক্রম অনুয়ায়ী কথা আলোচনা করা এবং সমাধানের জায়গাটির দিকে বেশি ফোকাস দেয়া।

সর্বোপরি যার যার জায়গা থেকে সবকিছু ক্লিয়ার হয়ে বুঝে নেয়া এবং ক্রসফাংশনাল কোন ইস্যু থাকলে সবার উপস্থিতিতেই সেগুলো ক্লিয়ার করে নেয়া।

মিটিংয়ের শেষে-
মিটিং শেষ করার সময় অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে সবাই যার যার দায়িত্ব ও করনীয় সম্পর্কে ক্লিয়ার হয়েছে কিনা এবং ডেডলাইন সহ পারফেক্ট একশন প্ল্যান লিখে নেয়া হয়েছে কিনা।

অন্যথায় পুরো সময়টাই হয়তো অপচয় হতে পারে!

এবং মিটিং শেষে মিটিং সামারি এবং কোন সিদ্ধান্ত ও ঘোষণা থাকলে সেগুলো সবাইকে মেইলে জানিয়ে দেয়াটাও প্রয়োজন। এবং আগের মিটিংয়ের কাজের ফলোআপ প্রতি মিটিংয়ে করাটা জরুরী!

সবশেষে, যেকোন মিটিং অনেক বেশি অংশগ্রহণমূলক ও কার্যকরী করা অর্থাৎ মিটিংয়ের সময়টাকে অপচয় হিসেবে না রেখে প্রোডাক্টিভ করার জন্য চারটি বিষয় মাথায় রাখা জরুরী-

১- যত বেশি সম্ভব অঅংশগ্রহণ সমন্বয় বাড়ানো এবং সেই সাথে পারস্পরিক সমন্বয় ও সহযোগিতা নিশ্চিত করা।
২- প্রত্যেকের দায়বদ্ধতার জায়গাটা বাড়ানো।
৩- মিটিংটা যে সবার জন্যই দরকার, প্রত্যেকেরই যে এখান থেকে পাওয়ার আছে বা মিটিংয়ে প্রপার ইনপুট দিলে সেটার ইফেক্ট বা বেনিফিট নিজের উপরেও আসবে বা ভালোকিছু হবে এই সেন্সটা সবার মধ্যে গ্রো করানো।
৪- মিটিংয়ে যারা অংশগ্রহণ করবে এই মিটিংয়ের মাধ্যমে তাদের প্রত্যেকের পার্সোনাল গ্রোথ হওয়ার জায়গাটা দেখানো বা সুযোগ তৈরী করে দেয়া।

সর্বোপরি একটি মিটিং দুইরকম ফলাফলই বয়ে আনতে পারে। হয় এটি সমস্যা সমাধান, প্রোডাক্টিভিটি এবং ক্রিয়েটিভিটি বাড়ানোর সবচেয়ে সেরা একটি মধ্যম হবে অথবা সবচেয়ে হতাশাজনক এবং একদম বৃথা অপচয় করা কিছু সময় হবে।

দুটোই নির্ভর করবে ঠিক কীভাবে মিটিংটি করা হবে তার উপর!

 

লেখক
নাজমুল হোসাইন
এইচআর প্রফেশনাল
বেঙ্গল গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ