ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ জানুয়ারী ২০২০

বিশ্ববিদ্যালয়ে সান্ধ্যকালীন কোর্স, কী ভাবছেন শিক্ষার্থীরা

:: ওয়াসিফ রিয়াদ || প্রকাশ: ২০১৯-১২-২২ ০৯:০১:৩২

‘সান্ধ্যকোর্স মুক্ত ক্যাম্পাস’ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবি। এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সান্ধ্যকোর্সের বিরুদ্ধে ২০১৪ সালে আন্দোলন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের সেই দাবি মেনে নেয়নি। সান্ধ্যকোর্স একটি বাণিজ্যিক প্রক্রিয়া ও এটি শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ব্যাহত করছে বলে দাবি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের।

এদিকে সান্ধ্যকোর্স নিয়ে রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য এ্যাড. মো. আবদুল হামিদের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার পর সান্ধ্যকোর্স বন্ধের নির্দেশনা দেয় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। ইউজিসির এই নির্দেশনার পর সান্ধ্যকোর্স বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে জগন্নাথ ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও কোর্সটি বন্ধ করবে বলে শোনা যাচ্ছে।

এবার এই তিন বিশ্ববিদ্যালয়ের পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও (রাবি) এমন সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে জোর দাবি উঠেছে। রাবিতে সান্ধ্যকোর্স থাকবে কি না এ বিষয়ে আগামী ২৪ ডিসেম্বর একাডেমিক কাউন্সিলের সভায় আলোচনা হবে। এদিকে এ বিষয়টি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমগুলোতে শুরু হয়েছে সমালোচনা। বিশ্ববিদ্যালয়ে সান্ধ্যকোর্স থাকা কতটুকু যৌক্তিক এ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেছেন ক্যারিয়ারটাইমস২৪.কম- এর রাবি প্রতিনিধি ওয়াসিফ রিয়াদ।

‘সান্ধ্যকোর্স’ উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করে

মেসবাহুল ইসলাম
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ

বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সান্ধ্যকালীন কোর্সগুলো মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে চালু হলেও তা তার উদ্দেশ্য থেকে সরে গিয়ে তা বাণিজ্যিকীকরণ করেছে। যার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষকরা সান্ধ্যকালীন কোর্সগুলোর দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ছে অর্থের জন্য। সান্ধ্যকালীন কোর্সের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারছে না।

যেহেতু শিক্ষা একটি নিরন্তর প্রক্রিয়া তাই শিক্ষা গ্রহণে কোন বাধা প্রদান করা উচিত নয়। বর্তমানে চাকরির বাজারে বিভিন্ন কোর্সে দক্ষতা চায়, তাই শিক্ষার্থীরা সান্ধ্যকালীন কোর্সের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। শুধুমাত্র বাণিজ্যিকীকরণের জন্য শিক্ষা প্রকৃত উদ্দেশ্য যেন ব্যাহত না হয়। সান্ধ্যকোর্সে ব্যস্ত থাকার কারণে শিক্ষকরা নিয়মিত পরীক্ষা নিতে ও সময়মত রেজাল্ট দিতে পারেননা।

ফলে সেশনজটের সৃষ্টি হয়। এর জন্য শিক্ষকরা গবেষণার দিকে মনোযোগী হচ্ছে না। ফলে দেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এই কোর্সে অনেকেই নিয়মিত ক্লাস না করেও পরীক্ষা দিচ্ছে ফলে নিম্নমানের গ্রাজুয়েট তৈরি হচ্ছে।

বিপাকে পড়ছে নিয়মিত শিক্ষার্থীরা

মুত্তাকিন অপরূপ
নৃবিজ্ঞান বিভাগ

সান্ধ্যকালীন কোর্সের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ব্যবসায়িক চরিত্র ধারণ করেছে। যেসব বিভাগে সান্ধ্যকোর্স চালু আছে ওই সকল বিভাগে কিছু শিক্ষকের সান্ধ্যকোর্সকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষার্থীদের বিপাকে পড়তে হচ্ছে। এর কারণে অনেক সময় ক্লাস-পরীক্ষা সময়মত অনুষ্ঠিত হয় না।

ফলে দিনের পর দিন শিক্ষার গুণগত মান ক্ষুণ্ন হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশোনা করেও পাচ্ছে না বিশ্বমানের শিক্ষা। এমতাবস্থায় আমি মনে করি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এই ধরনের সান্ধ্যকোর্সগুলো যেন বন্ধ হয়।

 

 

শিক্ষা ও বাণিজ্য একসাথে চলে না

মেহেদী হাসান মিশু
সমাজবিজ্ঞান বিভাগ

বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু বিভাগে সান্ধ্যকোর্স চালু রয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগের সেই শিক্ষকরা সান্ধ্যকোর্সের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। আর এসব মূলত বাণিজ্যিকভাবেই গড়ে উঠেছে। শিক্ষা ও বাণিজ্য একসাথে কখনই চলতে পারে না। এ সকল কোর্সগুলোতে ক্লাস হয় কিনা আর কেমন পরীক্ষার সিস্টেম সেটা আসলে আমরা সকলেই জানি। এটি টাকা দিয়ে সার্টিফিকেট কেনার মতন একটা বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অবস্থার পরিবর্তন না হলে ভবিষ্যতে একটা সমস্যার সৃষ্টি হবে, বিভাগগুলোতে কোর্স শিক্ষকরা মাঝে মাঝে ক্লাস নিতে পারেন না বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে। নিয়মিত ছাত্রদের ফলাফল দিতে অনেক সময় দেরি হলেও সান্ধ্যকোর্সের ফলাফল খুব দ্রুতই প্রকাশিত করা হয়।

সান্ধ্যকালীন কোর্সগুলোকে কিছু শিক্ষক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে। এতে করে সার্বিক শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে। অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন দিনে সরকারি ও রাতে বেসরকারি চরিত্র ধারণ করেছে। কিছু শিক্ষক আছেন যারা নিয়মিত কোর্সের ব্যাপারে অনেকটা উদাসীন। কিন্তু ইভিনিং কোর্স, ডিপ্লোমা কোর্স ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেয়ার ব্যাপারে তারা খুবই সময় সচেতন।

আমরা চাই সান্ধ্যকোর্সের নামে বিভিন্ন কোর্স খোলা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেটা অবশ্যই বন্ধ করা হোক। রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের পর ইউজিসি যে নির্দেশনা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সে নির্দেশনা মোতাবেক খুব দ্রুত সান্ধ্যকোর্স বন্ধ করা উচিত।

সান্ধ্যকোর্সের নামে চলে রমরমা ব্যবসা

তাসবিয়া ইসলাম তুলি
উর্দু বিভাগ

সান্ধ্যকোর্স একটা বাণিজ্য ছাড়া কিছুই না। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মুক্ত চর্চা হবে, পড়াশোনা হবে গবেষণা নির্ভর। সেখানে তা না হয়ে শুরু হয়েছে রমরমা সান্ধ্যকোর্সের ব্যবসা। এ ধরনের বাণিজ্যিক সনদপত্র বিক্রির পন্থাগুলো অবশ্যই বন্ধ হওয়া উচিত। এ ধরনের কোর্সের জন্য ভরি ভরি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। একটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মত কোর্স কেন জারি থাকবে? বিশ্ববিদ্যালয় একটা উন্মুক্ত প্রতিষ্ঠান যেখানে শিক্ষার্থীরা ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে নিজের মেধার প্রমাণ দিয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়। সেখানে টাকার বিনিময়ে কেউ একই সনদপত্র অর্জন করবে তা কখনো গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

এই সান্ধ্যকোর্স বন্ধের দাবিতে পূর্বেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জোরদার আন্দোলন গড়ে তুলেছিলো। কিন্তু তাদের দাবি মানা হয়নি উপরন্তু শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে চরম বাধার সম্মুখীন হয়। তবে মহামান্য রাষ্ট্রপতির সুদৃষ্টির ফলে আমরা আশাবাদী এ ধরনের সমস্যা অতি শিগগিরই সমাধান হবে। যা পূর্বের এবং বর্তমান সকল শিক্ষার্থীর কাম্য।

 

বঞ্চিত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা

শাকিলা খাতুন
মৃৎশিল্প ও ভাস্কর্য বিভাগ

সান্ধ্যকোর্স সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যপূর্ণ এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণার পরিপন্থী। টাকার জোরে সনদপ্রাপ্তির মত এমন বৈষম্য একটি গণতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে পারে না। সান্ধ্যকোর্সের ফলে গবেষণা ও পাঠদানের মান দিনের পর দিন কমছে। ‘সান্ধ্যকোর্স বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন নিয়মের সাথেই যায় না। যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই পর্যাপ্ত সুযোগ পাচ্ছে না, সেখানে সান্ধ্যকোর্সের কথা চিন্তাই করা যায় না।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ছিলো শিক্ষা হবে স্বল্পমূল্যে জনসাধারণের জন্য। কিন্তু এখনও আমরা অনেক টাকা খরচ করে পড়াশোনা করি। এর কারণে বঞ্চিত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। যদি শিক্ষার্থী বেশি হয় তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ডে’ এবং ‘নাইট’ দুইটি শিফ্ট করা যেতে পারে।

এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা পাবলিকলি পড়াশোনা করবে সেখানে কোন ধরনের বাণিজ্যের ছাপ রাখা যাবে না। এর আগেও ২০১৪ সালে বাণিজ্যিক সান্ধ্যকোর্স বন্ধের দাবিতে আন্দোলন হয়েছিল। তারপরেও তা এখনও বহাল রয়েছে। আমরা চাই এ ধরনের সান্ধ্যকোর্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উঠে যাক।