ঢাকা, মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট ২০২০

‘জননী ও জন্মভূমি স্বর্গাদপি গড়িয়সী’

:: মো. ফরিদ উদ্দিন মাসুদ || প্রকাশ: ২০২০-০১-০৮ ১৮:৩৬:৩৫

মো. ফরিদ উদ্দিন মাসুদ
বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

বছর দুয়েক আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশ অধ্যয়ন শিরোনামের এক কোর্স পড়ানোর সময় কোর্স শিক্ষক আমাদেরকে বিভিন্ন বইয়ের রিভিউ করতে বলেছিলেন। সবাই বিভিন্ন বইয়ের রিভিউ করেছিলো। আমি করেছিলাম ড. নীলিমা ইব্রাহীমের ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’।সেই বইটিতে লেখক বীরাঙ্গনাদের মর্মান্তিক চিত্র তুলে ধরেছেন।বীরাঙ্গনাদের তখন যুদ্ব বিধ্বস্ত দেশে কেউ স্বাভাবিকভাবে নেয়নি। এমনকি তাদের পরিবার পর্যন্ত তাদের গ্রহণ করতে চায়নি।এর পেছনে ছিলো সামাজিক মর্যাদার ব্যাপারস্যাপার ।যাইহোক সেখানে একটি বাক্য লেখিকা ব্যবহার করেছেন যে জননী ও জন্মভূমি স্বর্গাদপি গড়িয়সী। অর্থাৎ জননী এবং জন্মভূমি স্বর্গের চেয়েও পবিত্র।আমরা দীর্ঘ মুক্তি সংগ্রামের মধ্যদিয়ে আমাদের জন্মভূমিকে মুক্ত করেছি কিন্তু জননীকে মুক্ত করতে পারিনি।এখনো আমরা জননীর উপর হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ি।আমরা জননীদের ক্ষুধার্ত শকুনের মর্ত কামড়ে কামড়ে খাই।আমরা জননীদের কাছে আমাদের কাপুরুষত্ব জাহির করি।আমরা জননীদের দেখলে বন্যজাতি বনে যাই।আমরা জননীদের উপর নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করি।যেই আমি গতকাল মায়ের স্তন থেকে দুগ্ধ পান করেছি আজ সেই স্তনের উপর বুনো উল্লাস করি।আমরা জাতি হিসেবে নিকৃষ্ট জাতিতে পরিণত হয়েছি। এ দায় আমাদের আর কারো নয়।

ধর্ষণ একটি সামাজিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।এখনই এর প্রতিকার করতে না পারলে একসময় তা ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।সমাজকে বিকলাঙ্গ করে দিবে এই ধর্ষণ। আজকের এই সমস্যার জন্য দায়ী আমরা, দায়ী আমাদের বিচার ব্যবস্থা। ‘জাস্টিস ডিলেইড ইজ জাস্টিস ডিনাইড’ কথাটির সাথে আমরা সকলেই কমবেশি পরিচিত। পরিচিত এইজন্য যে এটা কেবল আমাদের সাথেই যায়। আমাদের সরকারদলীয় লোকেরা ‘আইনের চোখে সবাই সমান’ বলে এক ধরণের মুখস্ত বুলি নিয়মিতই আওড়ায়।এই মুখস্ত বুলি আওড়ানোর ফল হিসেবে আমরা দেখেছি সোহাগি জাহান তনু হত্যার বিচার না হওয়া।ভোটের রাতে তিন সন্তানের জননীকে ধর্ষণ করা হয়, বাবার দ্বারা মেয়ে ধর্ষিতা হয়।ধর্ষিতা হয় জানা অজানা অনেকেই কিন্তু বিচার পায় কয়জনা! তনুর বাবা আজও মেয়ে হত্যার বিচার দাবি করে কিন্তু তাতে সরকারের যায় আসেনা।তনুকে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় ধর্ষনের পর হত্যা করা হয়। ধারণা করা হয়ে থাকে সেক্ষেত্রে সেনাসদস্য কিংবা তাদের পরিবারের কেউ জড়িত।জড়িত যেই হোক বিচার কিন্তু হচ্ছেনা।যদি তনু হত্যার বিচার হতো কিংবা প্রতিটি ধর্ষণের বিচার হতো তাহলে আজ এমনটি নাও হতে পারতো।তনু হত্যার বিচার কাজ এখনও চলছে। অর্থাৎ জস্টিস ডিলেইড হচ্ছে এখনজাস্টিস ডিনাইড হবে। তবে গত পরশু আমার বোনের সাথে যে পাশবিক, বর্বর,নিকৃষ্টতর কাজটি করা হয়েছে তার বিচার অন্ততপক্ষে হবে বলে আশাকরি। বোনকে স্যালুট জানাই যে সে এমন পরিস্থিতিতেও ঠান্ডা মাথায় উঠে দাঁড়িয়েছে। আমার বোনকে দেখেই নজরুলের একটি লাইন মনে পড়ে যায়,’সধবা অথবা বিধবা তোমার রহিবে উচ্চ শীর, উঠো বীর জায়া বাধো কুন্তল মুছো এ অশ্রু নীড়।’আমার বোন উঠে দাঁড়িয়েছে এখন আমাদের দায়িত্ব হলো তার পাশে দাঁড়ানো।

সরকার চাইলে প্রতিটি ধর্ষণের বিচার করা সম্ভব।পুলিশ দায়িত্ব নিয়ে কাজ করলে অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব কিন্তু পরিতাপের বিষয় অনেক সময় পুলিশ মামলাই নিতে চায়না বিচার সে তো অমাবস্যার চাঁদ।এই বিচার না হওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেড় হতে আসতে হবে।

সমাজ থেকে ধর্ষণ নির্মুল সম্ভব এবং খুবই সম্ভব।এর জন্য চাই দ্রুত বিচার আইন ট্রাইব্যুনাল। যেখানে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ধর্ষণের বিচার করা হবে। একসময় এসিড নিক্ষেপণ ছিলো ভয়ানক সমস্যা। আজ এসিড সর্বত্রই পাওয়া যায় কিন্তু নারীর উপর এসিড নিক্ষেপ করা হয়না।এটা সম্ভব হয়েছে এর বিচারের জন্য।এসিড নিক্ষেপে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে।আশাকরি ধর্ষণের বেলায়ও এমন আইন হবে।

আমাদের বোনদেরকে এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ দিতে হবে।প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মেয়েদের মার্শাল আর্ট শেখানোর ব্যবস্থা করা জরুরী সেই সাথে আমাদের পুরুষদের দৃষ্টিপাত পরিবর্তন করতে হবে।জননীকে সর্বোচ্চ সম্মান দেয়ার মানসিকতা তৈরী করতে হবে।নারীর পাশে দাঁড়াতে হবে।তবেই আমাদের জননীকে রক্ষা করা যাবে অন্যথায় নয়।আশাকরি আমাদের ভিতরে কাপুরুষের বদলে সুপুরুষের উত্থান হবে