ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ জানুয়ারী ২০২০

প্রথম সমাবর্তনে ইতিহাস গড়বে জবি!

:: জবি প্রতিনিধি || প্রকাশ: ২০২০-০১-১০ ২১:১৫:৫৭

প্রতিষ্ঠার পর প্রথম সমাবর্তনে মিলিত হচ্ছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি)। আর প্রথম সমাবর্তনেই রেকর্ড করতে চলেছে কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া পুরান ঢাকার প্রাচীন এই প্রতিষ্ঠানটি। দেশের ইতিহাসে গ্রাজুয়েটদের সর্বোচ্চ অংশগ্রহণ হবে এই সমাবর্তনে!

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এর আগে এক সাথে এত পরিমাণ গ্রাজুয়েট বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাবর্তন পায়নি। প্রথম সমার্বতনের মহড়া শেষ হয়েছে আজ শুক্রবার। আগামীকাল ধূপখোলা মাঠে এই সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হবে। অংশ নিচ্ছেন ১৮ হাজার ৩১৭ জন। যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বলে দাবি করছেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

এর মধ্যেই শিক্ষার্থীরা পেয়েছে গাউন, টুপিসহ অনেক উপহার সামগ্রি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণতা মানেই সমাবর্তন। এবারই প্রথম জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন হওয়ার ফলে সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা কাজ করছে।

ক্যাম্পাস ঘুরে দেখা গেছে, শিক্ষার্থীরা সবাই একই রঙের কালো আবরণে মুড়ে আছে। দলভিত্তিক ও এককভাবে চলছে ছবি তুলার হিরিক। শিক্ষকদের সাথে ছবি উঠাতে ভিড় জমাচ্ছে বিভাগে। এতে শিক্ষকরা শত ব্যস্ত থাকলেও সাবেক শিক্ষার্থীদের সময় দিচ্ছে হাসি মুখে। কেউ কেউ আবার এক হয়ে আকাশে ওড়ার জন্য লাফ দিচ্ছেন। কেউবা আবার আকাশের দিকে ছুড়ে মারছে কালো রঙ্গের নির্ধারিত টুপি। সমাবর্তনের চিরচেনা উৎসবের এ ছোঁয়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। পুরো ক্যাম্পাসকে নতুনভাবে ধোয়ে মুছে পরিস্কার করে রং করা হয়েছে। লাল,সবুজের আলোতে সাজানো হয়েছে পুরো ক্যাম্পাসকে। সাথে রয়েছে নানা রকমের ফেস্টুন। এর সামনে দাঁড়িয়েই ছবি তুলতে দেখা যায় গ্রাজুয়েটদের।

দেড়শ বছরের ইতিহাস ঐতিহ্য মন্ডিত ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চৌদ্দ বছর পর এ সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। জবির খেলার মাঠ হিসেবে পরিচিত ধূপখোলা মাঠেই এ সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যেই সব প্রস্তুতি চূড়ান্ত বলে জানিয়েছেন জবি প্রশাসন। চলতি মাসের ৭ জানুয়ারি থেকে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাবর্তনের উপকরণ বিতরণ শুরু হয়। এছাড়া ৮ ও ৯ জানুয়ারি সমাবর্তনের উপকরণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে নিজ নিজ বিভাগে।

এ বিষয়ে উপকরণ ক্রয় কমিটির সদস্য সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক ড. মোস্তফা হাসান বলেন, ইতোমধ্যেই নিবন্ধনকৃত সকল গ্রাজুয়েটদেরকে গাউন ও অন্যান্য উপকরণ দেয়া হয়েছে। আমাদের সকল প্রস্তুতি সমপন্ন। রাত পোহালেই অনুষ্ঠান। এখন আমরা সে সময়ের অপেক্ষায় আছি। উপকরণ ক্রয়ে অতিরিক্ত টাকা ব্যয় করা হয়েছেকিনা এমন প্রশ্নের জবাবেতিনি বলেন, মিডিয়ার মাধ্যমে আমরা দেখতে পাই যে, সরকারি অনেক অফিস আদালতে পণ্য ক্রয়ে কয়েকগুণ টাকা বেশি খরচ করা হয়। সেখানে আমরা অতিরিক্ত টাকা ব্যায় করারত প্রশ্নই আসে না। বরং যে পণ্য অন্য জায়গায় দুইশত টাকায় বিক্রি করে আমরা সেটা আরও কম দামে কিনতে সক্ষম হয়েছি। ব্যবসায়ীদের আমরা বলছি যে, অন্য জায়গায় দশ ভাগ লাভ করলে আমাদের কাছে এক ভাগ করতে হবে। এভাবে আমরা উপকরণ ক্রয়ে ব্যায় কমিয়েছি।

সমাবর্তনে গ্রাজুয়েটদের অভিভাবকদের অংশগ্রহণ করতে অনুমোদন না দেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, এখানে গ্রাজুয়েট, শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীসহ প্রায় ২০ হাজারের উপরে। এই বিশ হাজার লোকের জন্য আলাদা গেট, নির্ধারিত সিট মেন্টেন কর্ইা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এখানে যদি অভিভাবকদের অন্তর্ভুক্ত করা হয় তাহলে ডাবল হয়ে যাবে। এটা মেইন্টেন করা অনেক কঠিন। যে কারণে আমরা এ বছর তাদের অনুমোদন দিতে পারিনি। তবে অভিভাবকদের অংশগ্রহণের অনুমিত দিতে পারলে শিক্ষক হিসেবে আমার কাছে খুব ভালো লাগত। তবে সিমাবদ্ধতার কারণে দেয়া যাচ্ছে না। তবে ভবিষ্যতে এ বিষয়ে লক্ষ্য রাখা হবে। সমাবর্তনে অনেক আনন্দের সাথে কাজ করছেন এবং সাবেক শিক্ষার্থীদের সাথে দেখা হয়ে ভালো লাগছে বলে তিনি অনুভতি প্রকাশ করেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস বিভাগের সাবেক ছাত্র তানভীর রায়হান এ বিষয়ে বলেন, ইতিহাস ও ঐতিহ্য লালিত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসে এটি প্রথম সমাবর্তন। আমার মতে সমাবর্তন শিক্ষা জীবনে সবচেয়ে বড় স্বপ্নবিজরিত দিন। সমাবর্তনকে কেন্দ্র করে হাজারো গ্র্যাজুয়েটদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছে ক্যাম্পাস। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে প্রথম সমাবর্তনে অংশগ্রহণের সুযোগ পাওয়ায় আমরা সবাই গর্বিত।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, প্রথম সমাবর্তনে সভাপতিত্ব করবেন বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর ও রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। সমাবর্তন বক্তা হিসেবে উপস্থিত থাকবেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের এমেরিটাস অধ্যাপক ড. অরুণ কুমার বসাক।

আরও জানা গেছে, যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতে পারেনি তারাও এই গাউন পড়ে ফটো তুলেছে। যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসেছে।

এছাড়া আরো জানা যায়, সমাবর্তনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০১২-২০১৩ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত স্নাতক, স্নাতকোত্তর, এমফিল, পিএইচডি ও সান্ধ্যকালীন ডিগ্রিধারী শিক্ষার্থীরা যারা অন্তত একটি ডিগ্রি জবি থেকে অর্জন করেছে তারাই অংশগ্রহণ করছে।

এর মধ্যে স্নাতক ১১ হাজার ৮৭৭ জন, স্নাতকোত্তর ৪ হাজার ৮২৯, এমফিল ১১, পিএইচডি ছয় ও ইভেনিং প্রোগ্রামের ১৫৭৪ জন অংশ নেবেন। এর মধ্যে ছেলে ১৩ হাজার ৭৬২ ও মেয়ে ৪ হাজার ৫৫৫ জন। যারা সুযোগ পেয়েও এ বছর সমাবর্তনে অংশগ্রহণ-আবেদন করেনি তারা আর কখনও সমাবর্তনে অংশগ্রহণ করতে পারবে না। সমাবর্তন উপলক্ষে ১৮ হাজার ৩১৭ জন শিক্ষার্থীর সার্টিফিকেট তৈরি করা হয়েছে। সমাবর্তনে অংশগ্রহণকারীদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দেয়া সমাবর্তন গাউন শিক্ষার্থীদের ফেরত দিতে হচ্ছে না।

১৮৫৮ সালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে আনুষ্ঠনিক যাত্রা শুরু করে। পরে এর নাম বদলে ১৮৭২ সালে ‘জগন্নাথ স্কুল’ করা হয়। ২০০৫ সালে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০০৫ পাসের মাধ্যমে এটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল স্লোগান হলো ‘শিক্ষা, ঈমান, শৃঙ্খলা’।

ধূপখোলা মাঠ সংলগ্ন মোহাম্মাদ সাঈদ খোকন কমিউনিটি সেন্টারের নিচতলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল প্রভাষক ও সহকারি অধ্যাপক এবং ২য় তলায় সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক অবস্থান করবেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল কর্মকর্তা সমাবর্তন স্থলে অবস্থান করবেন।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক মীজানুর রহমান বলেন, আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি সমপন্ন। আমরা আশা করছি সমার্তন অনুষ্ঠান সুন্দর ও সুষ্ঠভাবে শেষ হবে। এত বড় সমাবর্তনের আয়োজন করা খুবই কঠিন ছিল। তবে সকলের সহযোগিতায় সুন্দরভাবেই বিগত দিনের কাজ শেষ করেছি। এত বড় একটি কর্মযজ্ঞ করতে পেরে ভিসি হিসেবে আমার কাছে খুবই ভালো লাগছে।

উল্লেখ্য, কয়েক দফা পেছানোর পর জবির প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠান আজ ১১ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।