ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ জানুয়ারী ২০২০

ইউজিসির বার্ষিক প্রতিবেদ

বিশ্ববিদ্যালয়ে উপেক্ষিত গবেষণা খাত

:: রাসেল মাহমুদ || প্রকাশ: ২০২০-০১-১১ ০৯:২৮:৫০

উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার ‘মূল লক্ষ্য’ গবেষণা। এ পর্যায়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা নতুন জ্ঞানসৃষ্টির জন্যই বেশি পরিশ্রম করেন। এই ধারণা থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভব বলে মনে করেন শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা।

তবে দেশের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বরাবরই উপেক্ষিত গবেষণা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে পরিমাণ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সে পরিমাণ গবেষণা হচ্ছে না বলে বিভিন্ন মহল থেকে দাবি করা হয়।

বিশেষ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘উচ্চহারে’ টিউশন ফি নেয়া হলেও গবেষণা খাতে বরাদ্দ রাখা হচ্ছে খুবই কম। যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। আবার সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও কাঙ্ক্ষিত মানের গবেষণা হয় না বলে দাবি অনেকের।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ হচ্ছে গবেষণা। গবেষণা বা নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা না গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল্য উদ্দেশ্য পূরণ হবে না। এতে শিক্ষার মান ক্রমে নিম্নমুখী হতে থাকবে।

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) ৪৫তম বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে ৪৫টি। এরমধ্যে শিক্ষা কার্যক্রম চালু রয়েছে ৪০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের। ১০৩টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও শিক্ষা কার্যক্রম চালু রয়েছে ৯২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করছে বিপুল শিক্ষার্থী।

ইউজিসির হিসাব অনুযায়ী, সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মিলে শিক্ষার্থী রয়েছে ৪৪ লাখ ৫৬ হাজার ১৩৭ জন। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত রয়েছেন ৩০ হাজারের বেশি শিক্ষক। বিপুল শিক্ষক-শিক্ষার্থী থাকলেও গবেষণায় নিয়োজিতদের সংখ্যা খুবই কম। কারণ হিসেবে গবেষণা খাতে কম বরাদ্দের কথা বলা হচ্ছে।

ইউজিসির সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, শিক্ষা কার্যক্রম চালু থাকা ৯২টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ২০১৮ সালে গবেষণায় কোনো অর্থ ব্যয় করেনি ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয়।

আলোচ্য সময়ে ২৪টি বিশ্ববিদ্যালয় ব্যয় করেছে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত। পাঁচ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করেছে ১১টি বিশ্ববিদ্যালয়। আর ১০ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করেছে ১১টি বিশ্ববিদ্যালয়। অর্থাৎ সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত গবেষণায় ব্যয় করেছে ৬১টি বিশ্ববিদ্যালয়।

এদিকে, শিক্ষা কার্যক্রম চালু থাকা ৪০টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ২০১৮ সালে ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা খাতে কোনো ব্যয়ই করেনি। মাত্র ৪টি বিশ্ববিদ্যালয় এ খাতে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করেছে। আলোচ্য সময়ে সরকারি ২০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো প্রকাশনাই ছিলো না।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে যে পরিমান শিক্ষক-শিক্ষার্থী রয়েছেন সে তুলনায় গবেষণা খাতে ব্যয় করা হয়েছে খুবই কম। গবেষণা খাতে বছরে মাত্র ২০ লাখ টাকা ব্যয় কোনোভাবেই পর্যাপ্ত হতে পারে না।

ইউজিসির ৪৫তম বার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গবেষণা খাতে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করেছে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়। ২০১৮ সালে এ খাতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়টি ব্যয় করেছে ৩৮ কোটি ৭ লাখ ৬৪ হাজার টাকা।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ব্র্যাকের পর গবেষণায় ব্যয় করেছে ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটি। এ বিশ্ববিদ্যালয়টির ব্যয় ছয় কোটি ৭৫ লাখ ৮১ হাজার টাকা। পাঁচ কোটি ৫৬ লাখ ৭ হাজার টাকা ব্যয় করে পরের তালিকায় রয়েছে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি।

সোনারগাঁও ইউনিভার্সিটি ব্যয় করেছে চার কোটি ৮২ লাখ টাকা। আমেরিকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ চার কোটি ৩৪ লাখ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ তিন কোটি ছয় লাখ টাকা ব্যয় করেছে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে গবেষণা খাতে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করেছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। এ বিশ্ববিদ্যালয়টি ২০১৮ সালে ব্যয় ছিলো চার কোটি ৮৬ লাখ ৮৩ হাজার টাকা।

দুই কোটি ৯৩ লাখ ৫১ হাজার টাকা ব্যয় করে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। গবেষণা খাতে ২০১৮ সালে এক কোটি টাকার বেশি ব্যয় করেছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়।

এ বিশ্ববিদ্যালয়টির ব্যয় এক কোটি ৪০ লাখ। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যয় এক কোটি ৯৯ লাখ টাকা, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যয় এক কোটি ৯৪ লাখ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যয় এক কোটি ৮৬ লাখ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যয় এক কোটি ৪২ লাখ ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস এ খাতে ব্যয় করেছে এক কোটি ছয় লাখ টাকা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা খাতে ২০১৮ সালে কোনো ব্যয় দেখানো হয়নি।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে গবেষণা খাতে আলোচ্য বছরে কোনো টাকা ব্যয় করেনি পিপলস ইউনিভার্সিটি, ইবাইস ইউনিভার্সিটি, পুন্ড্র ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, ইউনিভার্সিটি অব সাউথ এশিয়া, রয়াল ইউনিভার্সিটি, ফার্স্ট ক্যাপিটাল ইউনিভার্সিটি, জেডএইচ সিকদার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।

গবেষণা খাতে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটি, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, লিডিং ইউনিভার্সিটি, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি, প্রাইম ইউনিভার্সিটি, নর্দান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বরেন্দ্র ইউনিভার্সিটি, হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ, নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, টাইমস ইউনিভার্সিটি, কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, এনপিআই ইউনিভার্সিটি ও নর্দান ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি, খুলনা অন্যতম।

এ ছাড়া ২০ লাখ টাকার মধ্যে ব্যয় করা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, সিটি ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সেস, প্রাইম এশিয়া ইউনিভার্সিটি, বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি, গ্লোাবাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ ও ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজ অন্যতম।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, গবেষণা খাতে অপ্রতুল ব্যয় নতুন জ্ঞান সৃষ্টির পথে বড় বাধা। এ খাতে আরও ব্যয় বাড়ানোর পরামর্শ দেন তারা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বিষয়টি নিয়ে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এগিয়ে নিতে হলে গবেষণা খুবই জরুরি। ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণায় এগিয়ে গেছে।

আমাদের ছেলে- মেয়েরাও অনেক মেধাবী। কিন্তু গবেষণার জন্য তারা বিদেশে গিয়ে আর ফিরে আসছে না। তাদের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে দেশে রাখতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে জুনিয়র ও সিনিয়র রিসার্চ ফেলো পদ সৃষ্টি করতে করা দরকার। আর ইউজিসিকেও পৃথকভাবে গবেষণার জন্য বরাদ্দ করে তা মনিটর করতে হবে। সূত্র: আমার সংবাদ