ঢাকা, বুধবার, ৮ এপ্রিল ২০২০

সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থী বেড়েছে, বেসরকারিতে কমেছে

:: রাসেল মাহমুদ || প্রকাশ: ২০২০-০১-১৩ ০১:০০:০৫

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে সদ্য সমাপ্ত বছরে নানা আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করতে দেখা গেছে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞজনদের। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা, উপাচার্যদের ‘নৈতিক স্খলন’, নেতিবাচক ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ড প্রশ্নবিদ্ধ করেছে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে।

এরপরও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি আস্থা রাখছেন বিদেশি শিক্ষার্থীরা। অন্যান্য বছরের তুলনায় ২০১৮ সালে দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিদেশি শিক্ষার্থী বেড়েছে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ সংখ্যা কমেছে। ২০১৮ সালে দেশের শিক্ষা কার্যক্রম চালু থাকা ৪০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ২৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮০৪ জন বিদেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। ২০১৭ সালে এ সংখ্যা ছিলো ৪৬১।

গত বছরের তুলনায় আলোচ্য বছরে বিদেশি শিক্ষার্থী বেড়েছে ৩৪৩ জন। ২০১৬ সালে এ সংখ্যা ছিলো ৩৫৫ জন। ২০১৫ সালে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থী ছিলো ৫৯৩ জন, ২০১৪ সালে ৪৩২, ২০১৩ সালে ৩২৬, ২০১২ সালে ৫২৫, ২০১১ সালে ২১০ এবং ২০১০ সালে ছিলো ৩৫৯ জন।

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) ৪৫তম বার্ষিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলোচ্য বছরে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি কমেছে। দেশের শিক্ষা কার্যক্রম চালু থাকা ৯১টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৮ সালে অধ্যয়নরত বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিলো এক হাজার ৩৮৬ জন।

২০১৭ সালে ছিলো এক হাজার ৯৭৭ জন। এক বছরের ব্যবধানে বিদেশি শিক্ষার্থী কমেছে ৫৯১ জন। তার আগের বছর ছিলো এক হাজার ৯২৭ জন। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত বিদেশি শিক্ষার্থী সম্পর্কে নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানটি ইতিবাচক মন্তব্য করছে।

প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের উচ্চশিক্ষার জন্য বিষয়টি অবশ্যই ইতিবাচক। এই ধারা অব্যাহত রাখার বিষয়টি নিয়েও ভাবছেন তারা। প্রতিবেদন অনুসারে, বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করছে বিশ্বের ৩৩টি দেশের শিক্ষার্থী। উন্নত এবং উন্নয়নশীল সব দেশের শিক্ষার্থীরাই প্রতিনিধিত্ব করছেন বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয়।

প্রতিবেদন বলছে, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ, চীন, জাপান, কেএসএ, যুক্তরাষ্ট্র, ইয়েমেন, ফিলিস্তিন, কম্বোডিয়া, গাম্বিয়া, মরক্কো, সাউথ কোরিয়া, তুরস্ক, উগান্ডা, জিম্বাবুয়ে, সিয়েরালিওন, তাইওয়ান, সোমালিয়া, ইথিওপিয়া, নাইজেরিয়া, আফগানিস্তান, তুর্কেমিনিস্তান, বাহরাইন, লাইবেরিয়া, জাম্বিয়া, জিবুতি, মিয়ানমার, কেনিয়া, সাউথ সুদান এবং ইংল্যান্ড। প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মিলে ২০১৮ সালে বাংলাদেশে অধ্যয়ন করছে দুই হাজার ১৯০ জন। গত বছর ছিলো দুই হাজার ৪৩৮ জন। বছরের ব্যবধানে কমেছে ২৪৮ জন।

ইউজিসির ৪৫তম বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী আলোচ্য সময়ে দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং এদের অধিভুক্ত কলেজ ও অঙ্গীভূত প্রতিষ্ঠানগুলোতে মোট শিক্ষার্থী ছিলো ৪০ লাখ ৯৪ হাজার ৩৪৫ জন।

এরমধ্যে ছাত্র ২২ লাখ ৩০ হাজার ৭২১ জন আর ছাত্রী ১৮ লাখ ৬২ হাজার ৫২৫ জন। আগের বছর ছিলো ৩৬ লাখ ছয় হাজার ১৩৭ জন। ২০১৮ সালে ১০৩টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বমোট শিক্ষার্থী ছিলো তিন লাখ ৬১ হাজার ৭৯২ জন। এরমধ্যে ছাত্রী এক লাক ১৪ হাজার ৬১৫ জন। ২০১৭ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছিলো তিন লাখ ৫৪ হাজার ৩৩৩ জন।

দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থী বৃদ্ধির বিষয়ে ইউজিসি ইতিবাচক মন্তব্য করেছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে ইউজিসি বলছে, গত বছরের তুলনায় আলোচ্য বছরে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫৯১ জন হ্রাস পেয়েছে। প্রদত্ত উপাত্ত থেকে দেখা যাচ্ছে, প্রতিবছরই বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও আলোচ্য বছরে কমেছে।

এর কারণ হিসেবে বলা যেতে পারে, বেশকিছু শিক্ষার্থী ক্রেডিট শেষ করে নিজ দেশে চলে গেছে। এবং গত বছর ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি চিটাগং-এ বিদেশি শিক্ষার্থী ছিলো ৬১৭ জন। কিন্তু আলোচ্য বছরে এ বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা শূন্য।

ইউজিসি আরও বলছে, বর্তমানে বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ব্যাপক ডিজিটালাইজেশন হয়েছে। ফলে বিদেশি শিক্ষার্থীরা তথ্য ও প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে উচ্চশিক্ষার কোর্স কারিকুলাম, সিলেবাস ইত্যাদি দেখে বাংলাদেশে পড়ার জন্য উদ্বুদ্ধ হচ্ছে।

পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, বেশ কয়েকটি উন্নত দেশ যেমন আমেরিকা, জাপান, চীন, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড ইত্যাদি দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা পড়তে এসেছে। সে কারণে বহির্বিশ্বে একদিকে যেমন বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হচ্ছে অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের হারও ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ধারা অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে শিক্ষার গুণগতমান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও উন্নীত করা বাঞ্ছনীয়।

সর্বশেষ প্রকাশিত ইউজিসির প্রতিবেদনে গত আট বছরের পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থী পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি ও হ্রাস পেয়েছে।

২০১০ সালে শিক্ষার্থী ছিলো ৩৫৯ জন, ২০১১ সালে ২১০ জন, ২০১২ সালে ৫২৫ জন, ২০১৩ সালে ৩২৬ জন, ২০১৪ সালে ৪৩২ জন, ২০১৫ সালে ৫৯৩ জন, ২০১৬ সালে ৩৫৫ এবং ২০১৭ সালে ৪৬১ জন, ২০১৮ সালে ৮০৪ জন। সেই হিসাবে তুলনামূলকভাবে সরকারি বিশ্ববিদ্যালগুলোতে সর্বোচ্চ সংখ্যক বিদেশি শিক্ষার্থী ২০১৮ সালেই ছিলো। এরপরই সর্বোচ্চ সংখ্যক শিক্ষার্থী ছিলো ২০১৫ সালে।

বাংলাদেশে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, অন্যান্য দেশের চেয়ে তুলনামূলক কম খরচ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মানসম্পন্ন শিক্ষা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমসহ নানা সুবিধার কারণে দেশে বিদেশি শিক্ষার্থী বাড়ছে বলে মনে করেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, এ ধারা অব্যাহত থাকলে বিশ্বের দরবারে শিগগিরই ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে আরও একধাপ এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।