ঢাকা, মঙ্গলবার, ২ জুন ২০২০

ত্রাণের চেয়ে সেলফি বেশি

:: মিনহাজ আবেদিন || প্রকাশ: ২০২০-০৫-০৬ ২১:৩১:৪৭

চলমান করোনা ভাইরাস মহামারী বিশ্বের নিম্ন মাথাপিছু আয়ের দেশগুলোকে দারিদ্রের চূড়ায় নিয়ে এসেছে। শুধু প্রতিরোধেই নয় অর্থনৈতিকভাবেও করোনা মোকাবেলায় হিমশিম খাচ্ছে স্বল্প উন্নত আয়ের দেশগুলো। আর এই চরম বাস্তবতায় বাংলাদেশের অসহায়, হতদরিদ্র, অসচ্ছল ও সাধারণ মানুষগুলো আর্থিকভাবে চরম বিপর্যস্ত হচ্ছে।

বিপর্যস্ত এই মুহুর্তে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি অসচ্ছল মানুষদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন দেশের বিত্তবানরা। ‘মানুষ মানুষের জন্য’ এই ব্রত নিয়েই এগিয়ে আসা উচিত ছিল তাদের। কিন্তু দূর্ভাগ্য হলেও সত্য এ সাহায্য মানবিকতার হাতকে প্রসারিত না করে লোক দেখানোর গণ্ডিতে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। সাহায্যের চাইতে নিজেকে প্রচার করা, জনপ্রিয় করে তোলার বাতিকটাই যেন মূখ্য। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম খুললেই আমরা ত্রাণের নামে এই তথাকথিত ফটোসেশনের অসুস্হ প্রতিযোগিতা দেখতে পাই।

লালসালু উপন্যাসটি হয়তো কমবেশি সকলেই পড়েছি। সেখানে আমরা দেখেছি “শস্যের চেয়ে টুপি বেশি”। কিন্তু বর্তমানে “ত্রাণের চেয়ে সেলফি বেশি”। একজন মানুষকে সাহায্য করতেও এখন ১০-১২জন মিলে ক্যামেরার সামনে এসে পোজ দিতে হচ্ছে। বর্তমান সময়ে এমন দৃশ্য বিরল নয়। যা আমাদের মানসিক নগ্নতার চিত্রই হয়ত তুলে ধরে। ‘সোনার বাংলা’ গড়তে যে সোনার মানুষের প্রয়োজন তাদের মানসিকতা কি এমনই হওয়া উচিত?

বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই প্রচারটাই এখন বেশি দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে ছবি তুলেই যেন তৃপ্তি তাদের। ত্রাণ কোথায় পৌঁছাচ্ছে, কতটুকু ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে অথবা যারা ত্রাণ পাওয়ার যোগ্য তারা ত্রাণ পাচ্ছে কিনা তার চেয়ে ত্রাণ বিতরণের সময় ছবি, সেলফি তোলার গুরুত্বটাই বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ত্রাণ কোন দান নয়। দূর্যোগালীন মুহুর্তে রাষ্ট্রের কাছ থেকে ত্রাণ পাওয়া নাগরিকের অধিকার। কিন্তু ত্রাণ বিতরণের নামে এই অসহায় মানুষদের যে সম্মানহানী ও হয়রানি করা হচ্ছে এর দায় কে নেবে?

সাহায্যের নামে ফটোসেশনের এই প্রতিযোগিতায় সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও পিছিয়ে নেই। দেখা যায় নেতা বা জনপ্রতিনিধিদের নাম, ছবি সংবলিত ত্রাণের প্যাকেট। অনেকেই আছে যাদের ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও শুধু ত্রাণের জন্য ক্যামেরার সামনে আসতে বাধ্য হচ্ছেন। আবার এমনও দেখা গেছে যাদের ত্রাণ প্রয়োজন কিন্তু সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার ভয়ে ত্রাণ নিচ্ছেন না।

এদিকে এই দুর্যোগে সরকার ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রি করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। জনপ্রতিনিধি ও নির্বাচিত ডিলারদের মাধ্যমে এই সব চাল অসচ্ছল মানুষগুলো কিনতে পারবেন। কিন্তু যে চাল জনগনের জন্যে নির্ধারণ করা হয়েছে সেটি পর্যাপ্ত নয়। আবার অনেক এলাকায় চালগুলো জনগনের কাছেই পৌঁছাচ্ছেই না।

সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত ত্রাণ বরাদ্দের কথা বলা হলেও ইউপি চেয়ারম্যান পর্যায়ে এসে এ ত্রাণ সামগ্রি চুরি করার নজির মিলেছে সীমাহীন। বৈশ্বিক দূর্যোগের এই মুহুর্তে আমরা জনপ্রতিনিধিদের কাছে যতটা দায়িত্বশীল আচরণ আশা করেছিলাম তার ছিঁটেফোঁটাও মিলছে না কোথাও কোথাও। অবৈধভাবে ওএমএসের চাল বিক্রির কারণে আওয়ামী নেতা গ্রেপ্তার, ত্রাণের চালসহ ইউপি সদস্য আটক, ৫৫৫ বস্তা সরকারি চাল জব্দ, ত্রাণের আড়াই টন চাল উদ্ধার এ ধরনের সংবাদগুলো প্রতিনিয়ত আমাদের হতাশ করে চলেছে। অসাধু এসব ব্যক্তিদের দ্রুত শাস্তির আওতায় এনে জনগণের আমানত ত্রাণ সামগ্রী বণ্টনের সুষ্ঠু ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

‘করোনা’ ও ‘মৃত্যু’ শব্দ দুটো এখন মানুষের কাছে সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই আগুনের দিন কবে শেষ হবে আমরা কেউই জানি না। এই দুর্যোগে সংকটে থাকা মানুষগুলোর পাশে থাকাই স্বস্তির নয় কি?ত্রাণের নামে সেলফি, ফটোসেশন, প্রচারণা আর কত? দেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিকসহ জনপ্রতিনিধিদের জনগনের পাশে থেকে সংকট উত্তরণের চেষ্টা করা এখন সময়ের দাবি। করোনাকালে পৃথিবীটা হোক মানবিক।

লেখক:
শিক্ষার্থী, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ,  রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।