ঢাকা, মঙ্গলবার, ২ জুন ২০২০

অনলাইন শিক্ষায় আসছেনা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো

:: রাসেল মাহমুদ || প্রকাশ: ২০২০-০৫-১৪ ১২:০৩:৪৫

করোনাভাইরাসের কবলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়েছে। গত ১৭ মার্চ থেকে কয়েক দফা বাড়িয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো রাখা হয়েছে বন্ধ। প্রায় দুই মাসের এ বন্ধে ইতিমধ্যে সেশনজটের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনলাইলে ক্লাস নিলেও পিছিয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। তবে শিক্ষা কার্যক্রম চালু থাকা ৪২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইনে শিক্ষায় তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছে না। এখন পর্যন্ত কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইন শিক্ষা শুরু করবে এমন ঘোষণা পাওয়া যায়নি।

তবে শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় জানিয়েছে তারা অনলাইন শিক্ষায় আসবে না। তাই সেশনজট তীব্র হবে বলে ধারনা করা হচ্ছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বলছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বন্ধের ক্ষতি পোষাতে সাপ্তাহিক ছুটিসহ অন্যান্য ছুটি কমিয়ে অতিরিক্ত ক্লাস নেওয়া হবে।

জানা গেছে, দেশে করোনার প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে গত ১৭ মার্চ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ফলে সকল শিক্ষার্থীদের মতো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এর মধ্যে গত ৩০ সেপ্টেম্বর শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক সভায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর সিদ্ধান্ত হয়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে সংসদ টিভিতে ক্লাস হচ্ছে। কলেজেও বিচ্ছিন্নভাবে অনলাইনে ক্লাস শুরু হয়েছে। কিন্তু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।

এদিকে, সামনের সারির কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ইতিমধ্যে জানিয়েছে তারা এখনই অনলাইনে ক্লাসে যাচ্ছে না। কারণ হিসেবে তারা বলছে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের অসংখ্য শিক্ষার্থী পড়ছেন। তাদের মধ্যে অধিকাংশ শিক্ষার্থীর প্রযোজনীয় উপকরণ (স্মার্ট ফোন, ল্যাপটপ, ইন্টারনেট সংযোগ) নেই। অনলাইনে পড়াশোনার মতো সুযোগ-সুবিধাও তেমন নেই। তাই বিদ্যমান পরিস্থিতিতে অনলাইন শিক্ষা সম্ভব নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) অনলাইন শিক্ষায় আসবে না বলে জানিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির
উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের সঙ্গে গত সোমবার অনলাইনে বিশ্ববিদ্যালয়টির বিভিন্ন অনুষদের ডিনদের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। তাতে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থীই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিজ নিজ বাড়িতে অবস্থান করছেন এবং ইন্টারনেটসহ প্রযুক্তিগত অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা না থাকায় অনলাইন ক্লাসে তাদের অংশগ্রহণের সক্ষমতা নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রায় একই ধরনের অবস্থানে আছে জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ফারজানা ইসলাম জানিয়েছেন, অনলাইনে ক্লাসের কথা তারাও ভাবছেন না।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ডিন ও বিভাগীয় প্রধানদের মতামতের জন্য অপেক্ষা করছে। মতামত পেলে বিকল্প বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এম আবদুস সোবহান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) নির্দেশনা অনুযায়ী অনলাইনের সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে জরিপ হিসেবে ডিন ও বিভাগীয় চেয়ারম্যানদের মতামত চাওয়া হয়েছে। মতামত পেলে বলা যাবে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এমফিল ও পিএইচডির কার্যক্রম অনলাইনে হলেও নিয়মিত ক্লাস অনলাইনে হবে না। বিকল্প কী করা যায়, সেটিও ঈদের পর বসে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য শিরীণ আখতার বলেন, আমরা অনলাইনে ক্লাস নিতে চেয়েছিলাম কিন্তু সব শিক্ষার্থীর পক্ষে অনলাইনে ক্লাস করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেকে আপত্তি জানিয়েছে। অনেকের ক্লাসে অংশ নেয়ার মতো অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল নাই।

তিনি আরও বলেন, অনলাইনে আমাদের সমস্যা হচ্ছে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেসব ছাত্রছাত্রীরা আছে তারা অনলাইনে আসতে পারছে না। তাছাড়া আমাদের কোনো কোনো বিভাগে এক শ্রেণিতেই শতাধিক শিক্ষার্থী, ফলে একটু সমস্যা দেখা দিচ্ছে।

সেশন জট নিরসনে বন্ধের পর বিশ্ববিদ্যালয় চালু হলে সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবার ও শনিবারও ক্লাস নেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি। তবে এ ব্যাপারে এখনও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

আর অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বলছে- বিদ্যমান পরিস্থিতিতে এখন অনলাইনে ক্লাসের পরিবেশ ও প্রস্তুতি, কোনোটাই তাদের নেই। তারা ইউজিসি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা সরকারের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার বলেন, অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নেয়ার মতো সক্ষমতা অনেক বিভাগের নেই। তাছাড়া শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় ডিভাইস আছে কিনা আমাদের সেসব চিন্তা করতে হচ্ছে। আবার ইন্টারনেট সংযোগ শহরে ভালো হলেও গ্রামে ততো ভালো না। এসব বিবেচনায় রেখে আমরা অনলাইন ক্লাসে অনাগ্রহী।

এদিকে, ৬ টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ১০ জন শিক্ষার্থীর সাথে অনলাইন শিক্ষা নিয়ে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তারা নিজেরাও এ ব্যাপারে অনাগ্রহ দেখিয়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আমজাদ হোসেন বলেন, শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নিতে অনলাইন অবশ্যই বিকল্প মাধ্যম হতে পারে। আমি মনে করি বর্তমান পরিস্থিতিতে এটাই একমাত্র মাধ্যম। কিন্তু বিপত্তি বাধে ইন্টারনেট নিয়ে। আমাদের দেশের ফোন কোম্পানিগুলো যে ইন্টারনেট সেবা দিচ্ছে তা সন্তোষজনক নয়। আমি এখন গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে রয়েছি। আমার এখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক খুব দুর্বল। এখানে নিরবিচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সুবিধা নেই। তাই অনলাইন ক্লাস বা পরীক্ষা দেয়া আমার পক্ষে অসম্ভব হবে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আঞ্জুয়ারা সুমি বলেন, মোবাইল ইন্টারনেটের ধীরগতি আর উচ্চ মূল্যের কারণে ঠিক মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমই ব্যবহার করতে পারি না। আর অনলাইনে ক্লাস হলেতো খুব বিপদে পড়ে যাবো।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বলেন, আমর স্মার্ট ফোন বা ল্যাপটপ নেই। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অনলাইনে ক্লাস পরীক্ষা চালু করলে আমি নিশ্চিতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবো।

বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান কাজী শহীদুল্লাহ বলেন, বাস্তবতা হলো, বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইনে পড়াশোনার মতো সুযোগ-সুবিধা নেই। তবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশনজট মোকাবিলার সামর্থ্য রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

তিনি বলেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশনজট মোকাবিলার অভিজ্ঞতা রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতায় অতিরিক্ত ক্লাস নিয়ে হয়তো একটি সেমিস্টারের (ছয় মাস) সেশনজট মোকাবিলা করতে পারবে। তবে ছুটি দীর্ঘ হলে সমস্যা হবে।