ঢাকা, মঙ্গলবার, ২ জুন ২০২০

রাবি শিক্ষার্থীদের ভাবনায় আসন্ন বাজেট

:: মিনহাজ আবেদিন || প্রকাশ: ২০২০-০৫-১৯ ২১:২৬:৫৮

সব ধরণের কার্যক্রম হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় করোকালীন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা চরম বিপাকে। আর এ দুর্যোগের মধ্যেই দেশের ২০২০-২১ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট পেশ করা হবে আগামী জুন মাসের ১০ তারিখে। আসন্ন এ বাজেটে কোন খাতে কতোটুকু গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন সে বিষয়ে মতামত দিয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষার্থীরা। তাদের সাথে কথা বলে লিখেছেন- মিনহাজ আবেদিন

সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষি, শিক্ষা ও গবেষণায় গুরুত্ব দিতে হবে

ফাহমিদা বেগম মিনা
জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগ

সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশেও করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে জনজীবন বিপর্যস্ত এবং ঠিক একইসাথে মুখ থুবড়ে পড়েছে দেশের অর্থনীতি। কোভিড-১৯ সংকটের মধ্যেই আগামী ১০ জুন জাতীয় সংসদে পেশ করা হবে ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট। এমতাবস্থায় দেশের অর্থনীতির এই অস্বাভাবিক সংকোচনে প্রচলিত বাজেটীয় ব্যবস্থা থেকে সরে এসে আগামী বাজেটে অর্থনীতি ফের চাঙা রাখতে কিছু নির্দিষ্ট খাতগুলোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করছি।

আগামী ২০২০-২০২১ অর্থবছরের বাজেটে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের পুনর্বাসনের দিক কেন্দ্রীয়  বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। যেসকল খাতে বিশেষ গুরুত্বারোপ করার প্রয়োজন। সেগুলোর মধ্যে স্বাস্থ্যখাত, সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষি, শিক্ষা ও গবেষণা খাত অন্যতম।

করোনাভাইরাসের মহামারী স্বাস্থ্য ও গবেষণা খাতে বাজেট বরাদ্দের প্রয়োজনীয়তা মানুষের চোখে আঙ্গুল দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে। করোনাভাইরাস নিয়ে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় সামর্থ্যে বা প্রস্তুতির বিচারে অনেক উন্নত দেশও পরাস্ত হয়েছে। ইউরোপ, আমেরিকার মতো দেশগুলোতে বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু থেকে এ কথা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

বাংলাদেশেও স্বাস্থ্য খাতে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যায়নি। জনবল, অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণ ঘাটতি প্রকটতার দরুন প্রথম তরঙ্গেই  স্বাস্থ্যব্যবস্থা দারুণভাবে ভেঙে পড়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার মাথাপিছু ব্যয় ও মাথাপিছু ‘জিডিপি বরাদ্দ’ সর্বনিম্ন। যার আমূল-পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে আগামী বাজেটে। সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর জনবল ও সরঞ্জাম বাড়ানোর পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যব্যবস্থার অবকাঠামোর উন্নয়ন করা, চিকিৎসাশিক্ষার মান উন্নয়ণ। চিকিৎসক ছাড়াও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী যেমন সেবিকা, প্রযুক্তিবিদদের সংখ্যা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ আবশ্যক।

বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ এখনো কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কৃষিতে উৎপাদন বহুমুখীকরণ, প্রতিযোগিতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং একইসাথে এই সেক্টরে উদ্যোক্তা গড়ার যাবতীয় কর্মকান্ডের নিশিতকরণের মধ্য দিয়ে অর্থনীতির চাকা সচল রাখার ব্যাপক সম্ভাবনা টিকিয়ে রাখতে কৃষিখাতে বাজেট বরাদ্দের ভূমিকা অনস্বীকার্য। সার্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি নিশ্চিত করে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নতির দিকে ফিরিয়ে আনতে এবং ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের অর্থনৈতিক সাবলম্বীতা ফিরিয়ে আনতে এই খাতে বাজেট বরাদ্দের ভূমিকা স্পষ্ট।

শিক্ষা খাতের সবচেয়ে অমনোযোগিতার ক্ষেত্রটি হলো উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা । আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন তাত্ত্বিক গবেষণা, জরিপ ও বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে সামষ্টিক অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জন এবং এসডিজি বাস্তবায়নে উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলোতে উচ্চশিক্ষা খাতে রাষ্ট্রীয় বরাদ্দ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চারটি খাতে বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত

রবিউল ইসলাম
মার্কেটিং বিভাগ

করোনাকালে পুরো বিশ্বের অর্থনৈতিক অবস্থা টালমাটাল। করোনা পরবর্তী অর্থনৈতিক অবস্থা সবার কাছে যেন ধোঁয়াশা অর্থাৎ গোলকধাঁধা। বাংলাদেশও এই অর্থনৈতিক মন্দার বাইরে নয়। উৎপাদন ব্যবস্থাপনা ও বাজারজাতকরণ থেকে শুরু করে সামাজিক নিরাপত্তাসহ সব জায়গায় স্বাভাবিকতায় বিঘ্ন ঘটছে। আসন্ন আগামী জাতীয় ২০২০-২১ বাজেট কেমন হবে এটা নিয়ে সবাই এখন উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে চারটি স্বাস্থ্য, কৃষি, সমাজিক নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান খাতে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের অবস্থা খুবই খারাপ। যা করোনাকালে স্পষ্ট। অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের নাগরিকদের চিকিৎসাসেবায় অনেক বেশি ব্যয় হয়। পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ইকুপমেন্ট, উন্নত মানের ল্যাব ইত্যাদির ঘাটতি রয়েছে। যার দরুণ করোনা রোগী ও মৃত্যুর হার জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে । বিগত বাজেটগুলোতে অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলেও শতাংশ পরিমাণ বৃদ্ধি পায়নি।  আগামী জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে দ্বিগুণ অর্থাৎ ১০ শতাংশ  বাজেট  প্রণয়ন করা দরকার। যেটি চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নয়ন ও সংকট সমাধানে সক্ষম হবে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় কৃষি খাত অন্যতম। প্রতি অর্থবছর বাজেটে কৃষি খাতে বরাদ্দ হ্রাস পাচ্ছে। কৃষি খাতে গুরুত্ব দিয়ে বাজেট প্রণয়ন করা এখন যৌক্তিক দাবি। শুধু  ভর্তুকির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে কৃষি উন্নয়নে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। কৃষি গবেষণা উন্নয়নের পাশাপাশি চাষ পদ্ধতি, সংগ্রহ প্রক্রিয়া উন্নয়ন ও কৃষকদের আর্থিক সহযোগিতার সুবিধা বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশের  জনগণ অসচেতন, লকডাউন মানছে না। সামাজিক  দূরত্ব বজায় রাখতে হবে জেনেও মানছে না। সরকারি ত্রাণ ব্যবস্থাপনা ও জটিলতা দেখা দিয়েছে। সেই সাথে পুলিশ প্রশাসন দায়িত্ব পালন করা সত্বেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। পরিস্থিতির তুলনায় পর্যাপ্ত  প্রশাসন ব্যবস্থায় ঘাটতি রয়েছে। কারাগারে কয়েদিদের অবস্থাও খুব করুন। প্রশাসন করোনা সংক্রমন রোধে মনোযোগ দেওয়ায় সামাজিক অপরাধ বৃদ্ধি নিয়েও শঙ্কা রয়েছে।  এবার বাজেটে সরকারকে সামাজিক নিরাপত্তার দিকে নজর দিতে হবে। সঠিক প্রক্রিয়ায়  ত্রাণ ও আর্থিক সুবিধা দুটিই নিশ্চিত করতে হবে। সামাজিক উন্নয়নে আগামী অর্থবছর বাজেট খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ জনবহুল দেশ হওয়ায় দরিদ্র ও বেকারত্বের সংখ্যা অনেক বেশি। করোনাকালে  ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও শিল্প কারখানা বন্ধ রয়েছে। ইতিমধ্যে কিছু  ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে দেউলিয়া ঘোষণা করা হয়েছে। জনসংখ্যার একটি বড় অংশ এখন চাকরিচ্যুত। ভবিষ্যতে জীবনযাত্রার মান কেমন হবে এটা নিয়ে আপামর জনসাধারণ চিন্তিত। সরকারকে কর্মসংস্থান তৈরিতে অগ্রনী ভুমিকা পালন করতে হবে। আইসিটি উন্নয়নের মাধ্যমে অনলাইন বিজনেস প্রতিষ্ঠা করাই দেশের জনগণকে উৎসাহিত করতে হবে। উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে যথোপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে।

স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে

আব্দুল ফাত্তাহ্ রাফি
ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ

বর্তমান গোটাবিশ্ব (কোভিড ১৯) নোভেল করোনা ভাইরাস মহামারিতে আক্রান্ত। এই মহামারি থেকে রক্ষা পাইনি বিশ্বের কোনো দেশ। বর্তমানে বাংলাদেশ রয়েছে বড় ঝুঁকির মধ্যে। গত ১৯ মার্চ বাংলাদেশে করোনা আক্রান্ত রোগি ছিল প্রায় ১৫ জন। তিন মাস পর সেটি দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজারে।

এই সংকটকালীন মুহূর্তে অর্থনীতির চাকা সচল রাখাই হবে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এদিকে আমাদের চলতি অর্থবছর শেষ হওয়ার পথে। আগামী জুন মাসের ১০ তারিখ বসতে যাচ্ছে ২০২০-২১ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট অধিবেশন।উক্ত অধিবেশনে পেশ করা হবে ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট। এই বাজেট কেমন হবে কোন কোন খাত গুলো বেশি গুরুত্ব পাবে তা নিয়ে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা, পর্যালোচনা ও পরামর্শ। এর মধ্যে সংবাদ পত্রের মাধ্যমে বাজেটের সম্ভাব্য আকার ও খাত ভিত্তিক বরাদ্দের কিছু অাভাস পাওয়া যাচ্ছে।

বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি ও বাংলাশেদের করোনা প্রার্দুভাবের উপর বিবেচনা করে ২০২০-২১ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট পেশ করা হবে বলে আমি মনে করি। এই বাজেট প্রস্তাবে স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়াই হবে যুক্তিযুক্ত।

পাশাপাশি অন্য যে সকল খাতে করোনা মহামারীর প্রভাব পড়বে তা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজনী বরাদ্দ ও কর্মসূচী থাকা প্রয়োজন। যেমন সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষি ও শিক্ষা খাতে। স্বাস্থ্য খাতে বিগত বাজেট গুলোতে সর্বোচ্চ বাজেটের ৬ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। আসন্ন অর্থবছরে এটি কয়েক গুন বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। এর পরেই সামাজিক নিরাপত্তা খাত গুরুত্বের দাবি রাখে। কারণ আমাদের দারিদ্রের হার ২০ শতাংশেরর কম হলেও করোনার কারণে এটি আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ।

বাংলাদেশ কৃষি নির্ভরশীল দেশ। অর্থনীতি চাকা সচল রাখতে হলে কৃষি খাতকে স্বাভাবিক রাখতে হবে। এজন্য উক্ত বাজেটে কৃষি খাতকে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে। শিক্ষায় জাতির মেরুদন্ড। শিক্ষাক্ষেত্রে প্রাথমিক থেকে উচ্চ শিক্ষা পর্যন্ত আমাদের শিক্ষা খাতের সকল পর্যায় করোনার কারণে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। মহামারী পরিস্থিতিতে শিক্ষা খাতের চ্যালেঞ্জ গুলো মাথায় রেখে এই খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। বিগত বাজেট গুলোতে শিক্ষা খাতে প্রায় জিডিপির ২ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। তা দ্বিগুণ করা প্রয়োজন। শিক্ষার ডিজিটাল অবকাঠামো জোরদার করে অনলাইনের মাধ্যমে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখা সময়ের দাবি।

এই সংকটকালীন সময় গতানুগতিক বাজেট দেওয়ার সুযোগ নেই। পরিকল্পিতভাবে স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষি ও শিক্ষা খাতে অবশ্যই বরাদ্দ বেশি দিতে হবে। একটি সুষম বাজেট সুন্দরভাবে সম্পাদনের জন্য প্রয়োজন সততা। নিষ্ঠা, দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহিতা। তাহলেই বাজেটের প্রয়োগ, ব্যবহার ও বাস্তবায়ন সঠিক হবে।

২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট সরকারের একটি মহা চ্যালেঞ্জ এবং জাতির অগ্রগতি ও উন্নয়নের মহাপরিক্ষা। এই চ্যালেঞ্জ উত্তীর্ণ হতে পারলেই বাংলাদেশে অাগামী যাত্রায় হবে বিপদমুক্ত। ২০২১ ও ২০৪১ এর লক্ষমাত্রা পুরণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে এটি। বাংলাদেশ হবে স্বনির্ভরশীল, সমৃদ্ধ ও স্বাবলম্বী। বিশ্ব দেখবে এক অন্যান্য বাংলাদেশ।