ঢাকা, মঙ্গলবার, ২ জুন ২০২০

প্রবোধকুমার থেকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

:: মো. ফরিদউদ্দিন মাসুদ || প্রকাশ: ২০২০-০৫-১৯ ২২:৩৫:১০

১৯২৮ সাল,কলেজের হোস্টেলে এক দল ছেলেপেলে তর্কে মেতেছে। তাদের আলোচনার বিষয় হল: প্রকাশকেরা নতুন লেখকদের লেখা প্রকাশ করতে চায়না। কারণ নতুনদের লেখায় কাটতি নেই তাই তারা ঝুঁকি নিতে চায়না। এছাড়াও নতুনদের অবজ্ঞা করার বিষয় তো আছেই। এমন সময় হঠাৎ এক বন্ধু তাদের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বললেন, আমি লেখা দিবো এবং পত্রিকা তা প্রকাশ করবেই। শুরু হলো চ্যালেঞ্জ। বন্ধুদের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েই বসলেন খাতা-কলম নিয়ে। পরের দিন পত্রিকায় প্রকাশিত হলো ‘ অতসী মামী’ শিরোনামে একটি গল্প। গল্পের লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়।

আসলে তার নাম প্রকৃত নাম প্রবোধকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। গল্পের লেখকের ছদ্মনাম আসার কারণ হলো, তার দাদার ভয়।তার দাদা ছিলেন একজন ডাক্তার। আর প্রবোধকুমার ছাত্র হিসেবে খুবই মেধাবী ছিলেন। তার দাদার ইচ্ছে ছিলো প্রবোধ আই এস সি পাশ করে  মেডিকেল কলেজে ভর্তি হবেন  এখন দাদা যদি দেখেন প্রবোধ পড়াশোনা না করে সাহিত্য নিয়ে পড়ে আছে তাহলে বকা খেতে হবে।সেই ভয়েই প্রবোধকুমার বনে গেলেন বাংলা সাহিত্যের এক শক্তিমান লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় হিসেবে।

প্রবোধকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এর জন্মটা হয়েছিল তার বাবার কর্মস্থল বিহারের সাঁওতাল পরগনার দুমকা শহরে ১৯০৮ সালের ১৯ মে। তার পৈত্রিক নিবাস ছিলো বিক্রমপুরে। তার বাবা ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানের গ্রাজুয়েট এবং ব্রিটিশ সরকারের একজন আমলা ছিলেন।পরবর্তীতে তিনি ডেপুটি মেজিস্ট্রেট হিসেবে অবসরে যান।

বাংলা সাহিত্যের এই বরপূত্র ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে প্রবেশিকা পাস করেন। পরে বাঁকুড়া ওয়েসলিয়ন মিশন কলেজ থেকে আইএসসি (১৯২৮) পাস করে তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে বিএসসি-তে ভর্তি (১৯২৮) হন, কিন্তু সাহিত্যের প্রতি গভীর আসক্তি থাকায় পাঠ অসমাপ্ত রেখেই পেশাগত জীবনে প্রবেশ করেন। কর্মজীবনে চাকরি করেছেন ‘উদয়াচল প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিশিং হাউস, বঙ্গশ্রী (১৯৩৭-৩৯) পত্রিকা,ভারত সরকারের ন্যাশনাল ওয়ার ফ্রন্টের প্রভিন্সিয়াল অরগানাইজার এবং বেঙ্গল দপ্তরে প্রচার সহকারী পদে।

ত্রিশোত্তর দশকে রবীন্দ্র- শরৎ বলয়ের বিরোধিতা করে যে কল্লোল শিল্পীগোষ্ঠীর উদয় হয়েছিলো মানিক ছিলেন তার অগ্রভাগে।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম জীবনে ফ্রয়েডের মনঃসমীক্ষণ তত্ত্বের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন এবং ইয়ুং, এডলার প্রমুখ ব্যক্তিবর্গও তার জীবনে প্রভাব বিস্তার করেন।কিন্তু শেষ পর্যায়ে তিনি চরম মার্ক্সবাদী চিন্তাধারায় প্রভাবিত হন।এছাড়াও তিনি ১৯৪৪ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন। তিনি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তার কলম উঁচিয়ে ধরেন।সমাজে শ্রেণিবৈষম্য, ফ্যাসিবাদ, অনাচার, বিভেদ এগুলোর বিরুদ্ধে শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার হিসেবে সাহিত্যের কলমমেই মানিক বেছে নেন। এক্ষেত্রে মানিক একজন দক্ষ শিল্পী।

মানিক   তার সাহিত্য জীবনে অর্ধশতাধিক উপন্যাস ও দুশো চবিবশটি গল্পরচনা করেছেন।

পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাসে  জেলেপাড়ার মাঝিদের অভাব অনটন যৌনজীবন ইত্যাদির মধ্যদিয়ে তার সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শ প্রচাররের প্রয়াস চালান।উপন্যাসটি মানিকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি।

এছাড়াও পুতুলনাচের ইতিকথা মানিকের অনিন্দ্য সৃষ্টি।হুমায়ুন আহমেদের মতে এটি পৃথিবীর ইতিহাসে সেরা পাঁচটি বইয়ের একটি। বইয়ের প্রতিটি লাইনে লাইনে যেনো আছে দর্শনের ছোঁয়া।এছাড়াও জননী উপন্যাসে তিনি দেখিয়েছেন একজন মা সন্তানের জন্য কিভাবে জীবনে ত্যাগ স্বীকার করে।প্রাগপ্রাগৈতিহাসিক গল্পে তিনি দেখিয়েছেন সমাজের ভিখু তার পায়ের ঘা’ কে পুঁজি করে তা জিয়িইয়ে রেখে ভিক্ষাবৃত্তি করে যা আমাদের সমাজের উচ্চবর্গের ব্যক্তির মাঝেও লক্ষ্য করা যায়।এভাবেই তিনি মানবজীবন ও নগরজীবনের সমস্যা সৃষ্টিতে মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন।

প্রবোধকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গন্থ: উপন্যাস জননী (১৯৩৫), দিবারাত্রির কাব্য (১৯৩৫), পদ্মানদীর মাঝি (১৯৩৬), পুতুলনাচের ইতিকথা (১৯৩৬), শহরতলী (১৯৪০-৪১), চিহ্ন (১৯৪৭), চতুষ্কোণ (১৯৪৮), সার্বজনীন (১৯৫২), আরোগ্য (১৯৫৩) প্রভৃতি; আর ছোটগল্প অতসী মামী ও অন্যান্য গল্প (১৯৩৫), প্রাগৈতিহাসিক (১৯৩৭), সরীসৃপ (১৯৩৯), সমুদ্রের স্বাদ (১৯৪৩), হলুদ পোড়া (১৯৪৫), আজ কাল পরশুর গল্প (১৯৪৬), মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ গল্প (১৯৫০), ফেরিওয়ালা (১৯৫৩) ইত্যাদি। পদ্মানদীর মাঝি ও পুতুলনাচের ইতিকথা  উপন্যাস দুটি তাঁর বিখ্যাত রচনা। এ দুটির মাধ্যমেই তিনি সর্বাধিক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। পদ্মানদীর মাঝি চলচ্চিত্রায়ণ হয়েছে।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। তিনি পূর্ববঙ্গ প্রগতি লেখক ও শিল্পী সঙ্ঘের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি এর যুগ্ম-সম্পাদক নির্বাচিত হন। দুবার তিনি এ সঙ্ঘের সম্মেলনে সভাপতিত্বও করেন। ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় তিনি কলকাতার টালিগঞ্জ অঞ্চলে ঐক্য ও মৈত্রী স্থাপনের প্রয়াসে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে বোম্বেতে অনুষ্ঠিত প্রবাসী বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনের গণসাহিত্য শাখায় এবং ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দের ৪ এপ্রিল প্রগতি লেখক ও শিল্পী সঙ্ঘ আয়োজিত জোসেফ স্টালিনের শোকসভায় তিনি সভাপতিত্ব করেন(বাংলা পিডিয়া)

ব্যক্তিজীবনে মানিক মৃগী রোগী ছিলেন।জীবনের শেষ পর্যায়ে  প্রচুর অর্থ কষ্টে এবং দুরারোগ্য ব্যধিতে আক্রান্ত হন। ১৯৫৬ সালের ৩রা ডিসেম্বর চলে যান না ফেরার দেশে । আজ বাংলা সাহিত্যের এই অপরাজেয় শিল্পীর জন্মদিন। জন্মদিনে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা আর ভালবাসা।

লেখক:
শিক্ষার্থী
বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।